রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ করেছে বর্মী সেনারা

রোহিঙ্গা অনেক নারীকে গ্যাং-রেপ বা গণধর্ষণ করেছে মিয়ানমার আর্মি।

বর্মীদের অত্যাচার থেকে প্রাণে বাঁচতে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া এমন অসংখ্য নারীর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সহিংসতায় যৌননির্যাতন বিষয়ক জাতিসংঘ টিম। এ টিমের সদস্যরা  মিয়ানমার সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গত দুই সপ্তাহ কাটিয়েছেন। তারা সেখানে নির্যাতনের ক্ষত বয়ে বেড়ানো নারী ও কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের ওপর চালানো বর্মী নির্যাতনের কাহিনীগুলো রেকর্ড করেছেন। প্রতিনিধি দলের প্রধান জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত প্রমীলা পাট্রিনও গত ৩ দিন তার টিমের (এডভান্স টিম) সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারে কাটিয়েছেন। তিনি উখিয়ার কুতুপালং এবং নো-ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেছেন।
সেখানে রোহিঙ্গা নারীদের মুখে তাদের ওপর বয়ে যাওয়া বর্বরতার ধরন এবং রকমফেরগুলো শুনেছেন। তার ভাষায় ‘সেখানে যৌন সহিংসতার ভয়ঙ্কর সব ঘটনা শুনেছি আমি।’ আন্ডার সেক্রেটারি পদমর্যাদার জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি প্রমীলা পাট্রিন গতকাল রাজধানীর এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে তার সফরের ফাইন্ডিংস এবং অবজারভেশন তুলে ধরেন। বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্যরা গণধর্ষণসহ নানা রকম যৌন নির্যাতন করেছে। বেসামরিক মানুষের ওপর এমন যৌন সহিংসতায় জড়িতদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, রাখাইনে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা নারীদের কাছ থেকে আমরা যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো শুনেছি। একজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাকে ৪৫ দিন বন্দি করে রেখেছিল মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী। এ অবস্থায় বার বার ধর্ষণের শিকার হন তিনি। পাট্রিন বলেন, নির্যাতনের শিকার অন্যরাও দৃশ্যমান ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের শরীরে ক্ষতচিহ্ন, আঘাতের দাগ, কামড়ের ছাপ রয়েছে, যা তাদের ওপর হওয়া নিপীড়নের সাক্ষ্য দেয়। তাদের ওপর যারাই যৌন সহিংসতা চালিয়েছে এবং এর হুকুম ও সায় দিয়েছে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। কোনোরকম রাখঢাক না করে তিনি বলেন, সিরিজ এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনার মূল হোতা মিয়ানমার আর্মি। তারা নিজেরা নারীদের ধর্ষণ করেছে ধারাবাহিকভাবে। অন্যদেরকেও এটি করতে হুকুম এবং উৎসাহ দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে বর্মী সেনারা ‘তাতমাদাও’ বলে পরিচিত। জাতিসংঘ দূত বলেন, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের অনেক সদস্য এবং রাখাইন বুড্ডিস্ট এবং অন্য এথনিক সমপ্রদায়ের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত মিলিশিয়ারাও নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। এতে অনেকে মারাও গেছেন। বর্মী বাহিনী এবং তাদের দোসর মিলিশিয়াদের নির্যাতন থেকে কেউই রক্ষা পায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমপ্রদায়কে রাখাইন থেকে সমূলে উচ্ছেদ করার জন্য নারীদের ওপর এমন বর্বরতা চালানো হয়েছে। তাদের টর্চার করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে অনেককে। বাড়িঘর লুট এবং গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। এ বর্বরতা থেকে শিশুরা, যারা আগামী দিনে রোহিঙ্গা সমপ্রদায়ের ভবিষ্যৎ এবং প্রতিনিধিত্ব করবে তারাও রক্ষা পায়নি। এত কিছুর পরও কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গা  রাখাইনে তাদের নিজ ভূমে ফিরতে চায় বলে জানিয়ে জাতিসংঘ দূত বলেন, তারা তাদের বসতভিটায় ফিরতে চায়। রাখাইনে অন্য সমপ্রদায়ের মতো তারাও নাগরিকত্ব এবং সমান অবস্থান চায়। অন্যরা অবশ্য বলেছেন, তাদের ফেরার কোনো জায়গা নেই। সব ছাই হয়ে গেছে। তাদের ফেরত যাওয়া নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও সবাই এক বাক্যে বলেছেন, তাদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে তার বিচার তারা দেখতে চান। জাতিসংঘ দূতের কাছে প্রশ্ন ছিল এসব ঘটনার বিচার কিভাবে হবে, দায়ীদের কিভাবে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে, যেখানে মিয়ানমার সব ঘটনাই অস্বীকার করে চলেছে। জবাবে তিনি বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাব্য উপায়গুলোর অন্যতম হলো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ গ্রহণ। তিনি তার ম্যান্ডেট মতে নিউ ইয়র্কে ফিরে গিয়েই নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে মাঠ পর্যায়ে পাওয়া তথ্যাবলী তুলে ধরে যৌন সহিংসতার বিস্তারিত অবহিত করবেন। কক্সবাজার সফর এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত ভয়ঙ্কর কাহিনীগুলো তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চেয়ার এবং প্রসিকিউটরদের সঙ্গে শেয়ার করবেন বলেও জানান। নিরাপত্তা পরিষদ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে গ্যাং-রেপসহ যৌন সহিংসতার গুরুতর অপরাধগুলোর বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশনা দিতে পারে। আগে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত হতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় চীন যেখানে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সেখানে নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন বা প্রস্তাব পাস করা যে কঠিন হবে সেটিও ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তা। তবে তিনি স্মরণ করেন সিরিয়ায় এমন অভিযোগের বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ নিয়েছিল। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতায় জাতিসংঘ ব্যবস্থা নিয়েছিল। এ নিয়ে কথা না বাড়িয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী রিপোর্ট দেবো। সুপারিশেও তা তুলে ধরবো। আমি এবং আমার অফিস ভয়েস রেইজ করবে। পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদের। বাংলাদেশে তার নেতৃত্বে যে মিশন কাজ করেছে তা নিজেদের রেকর্ড এবং বিষয়গুলো আরো ভালো করে বুঝার জন্য মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি কোনো ফ্যাক্ট ফাউন্ডিং মিশন নয়। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তা মিয়ানমারে সফর করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুচি সরকার তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং তাদের সহায়তা দেয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকার এবং এদেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, বাংলাদেশ কেবল সীমান্ত খুলে দেয়নি। তাদের হার্ট এবং বাড়িঘরও খুলে দিয়েছে। মানবতার জন্য বাংলাদেশ যা করেছে তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, একটি বিষয় নিশ্চিত করতে চাই এ সংকটে বাংলাদেশ একা নয়। আমি রোহিঙ্গা নারীদেরও বলতে চাই আপনারাও একা নন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের স্পট লাইটে রয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানবতার এ সংকটের সমাধান আসবে বলে আশা করেন তিনি।

Read 45 times
Rate this item
(0 votes)
Published in ফিচার
Super User

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Mauris hendrerit justo a massa dapibus a vehicula tellus suscipit. Maecenas non elementum diam.
Website: smartaddons.com

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.

Subscribe to our newsletter

ইভেন্ট

ছবি ও ভিডিও

Style Setting

Fonts

Layouts

Direction

Template Widths

px  %

px  %