বিপিসির ৩ বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা লাভ

অর্থনীতি
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

বিপিসির ৩ বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা লাভ


বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাত তুলে জাতীয় নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। গত কয়েক বছর এই পেট্রোলিয়াম পণ্যটি কম দামে আমদানি করে বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাটি হাজার হাজার কোটি টাকা এরই মধ্যে লাভ করেছে। সরকারের ভেতর ও বাইরে থেকে তেলের দাম কমানোর পরামর্শ এলেও দাম কমানো হয়নি। কিন্তু এখন বিশ্ববাজারের বেশি দামের অজুহাত তুলে দেশের বাজারেও দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রস্তাবনায় বিপিসি দাবি করেছে, বাড়তি দামে আমদানি করে কম দামে বিক্রির কারণে তাদের প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এ ছাড়া পাশের দেশে দাম বেশির কারণ দেখিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তেল ভারতে পাচার হতে পারে। যদিও বিশ্নেষকরা বলছেন, নির্বাচনী বছরে তেলের দাম বাড়ানোর মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য ঠিক হবে না।

২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল। এ সময় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকেও তেলের মূল্য কমানোর দাবি জানানো হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও বার বার জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুপারিশ করেছিল। কিন্তু জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ দাম কমানোর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। জ্বালানি বিভাগ যুক্তি দিয়েছিল, বেশি দামে আমদানি করে কম দামে বিক্রি করার ফলে বিপিসি বহু বছর লোকসান দিয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন লাভ করা প্রয়োজন। বিপিসিও তেলের দাম কমানোর বিরোধিতা করেছিল। শুধু ২০১৬ সালে একবার নামমাত্র তেলের মূল্য কমানো হয়েছিল। সরকারি হিসাবে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে বিপিসি ট্যাক্স-ভ্যাটসহ সব খরচ বাদেও ১৫ হাজার কোটি টাকা নিট লাভ করেছে। যদিও প্রকৃত মুনাফা আরও অনেক বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।

বিপিসি সূত্র বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে বিশ্ববাজারে আবার তেলের দাম বাড়ছে। বিপিসির দাবি, গত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ৫০০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এজন্য গত ৭ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে, প্রতি লিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৭ টাকা করে এবং ফার্নেস অয়েলের দাম ১৩ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়। পেট্রোল অকটেনের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়নি। কারণ এ দুটোতে বিপিসির কোনো লোকসান হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্ব্বয়ে দেশে কোনো সঠিক নীতিমালা নেই। বিপিসির প্রস্তাব নিয়ে সরকারই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ঠিক করে থাকে। তবে তেলের দাম সরকারই নির্ধারণ করে। বিদ্যুতের দাম কমানোর বিষয়ে কমিশনে গণশুনানি হলেও তেলের দামের ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। এখানে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এ ছাড়া বিপিসির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়সহ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিপিসির আর্থিক অস্বচ্ছতার বিষয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ এনেছে। তারা আন্তর্জাতিক অডিট সংস্থার মাধ্যমে বিপিসির নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি জ্বালানি বিভাগ। তাই বিপিসির লোকসানের দাবি করলেও তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গত কয়েক বছর বিপিসি কী পরিমাণ লাভ করেছে, তার সঠিক হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, এটা নির্বাচনের বছর। কোনো সরকার এ সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পণ্যটির দাম বাড়িয়ে অজনপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি নেবে না। এ সময়ে দাম বৃদ্ধির কোনো যুক্তিও থাকতে পারে না।

তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, গতবছরের জুনে অর্থ মন্ত্রণালয় এক প্রতিবেদনে ডিজেল ও কেরোসিনে লিটারপ্রতি ৮ শতাংশ এবং অকটেন ও পেট্রোলের দাম ৫ শতাংশ কমানোর সুপারিশ করেছিল। এতে বলা হয়েছিল, এর পরও বিপিসির এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা লাভ থাকবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গত বছরের এপ্রিলে তাদের এক পর্যালোচনায় তেলের দাম কমানো হলে অর্থনীতিতে বেশ কিছু সফলের কথা বলেছিল। কিন্তু জ্বালানি বিভাগ দাবি করেছিল, দাম কমানো হলেও সাধারণ জনগণ এর সুফল পাবে না।
বিপিসি বলেছে, গত বছরের জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারল ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ৪৭ ডলার। এটা এখন বেড়ে ৭১ ডলার হয়েছে। এতে প্রতি লিটার ডিজেলে ৫ টাকা ২৪ পয়সা, কেরোসিনে চার টাকা ৭৪ পয়সা এবং ফার্নেস অয়েলে ৯ টাকা ৮০ পয়সা লোকসান হচ্ছে। সংস্থাটি ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১১ শতাংশ বাড়িয়ে ৭২ টাকা প্রতি লিটার এবং ফার্নেস অয়েলের দাম ৩১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান প্রতি লিটার ডিজেল ৬৫ টাকা, কেরোসিন ৬৫ টাকা, পেট্রোল ৮৬ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা ও ফার্নেস অয়েল ৪২ টাকা।

জানতে চাইলে বিপিসির পরিচালক (মার্কেটিং) মীর আলী রেজা মিডিয়াকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করায় তারা এখন প্রতিদিন ১০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছেন। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে তেলের দাম কম। তাই তেল পাচারের আশঙ্কা রয়েছে। এটা রোধে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সব বিষয় মাথায় রেখে তারা একটা প্রস্তাব করেছেন।

কলকাতায় ডিজেল বিক্রি হয় ৬৫ দশমিক ০৮ রুপি, যা বাংলাদেশের মুদ্রায় ৮৪ টাকা ২৪ পয়সা। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৯ টাকা বেশি দামে সেখানে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে।

আলী রেজা আরও বলেন, বিপিসি ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা লোকসান দিয়েছে। এরপর যে লাভ হয়েছে সেই অর্থে ঋণ পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া লাভের টাকায় তারা ইআরএল ইউনিট-২, ঢাকা-চট্টগ্রাম তেল পাইপলাইন, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং টার্মিনাল নির্মাণ, পায়রা বন্দর এলাকায় একটি নতুন তেল পরিশোধনাগার, নারায়ণগঞ্জ থেকে বিমানবন্দর পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের কোনো সঠিক নীতিমালা নেই। সরকারকে ঠিক করতে হবে তারা জনগণকে কী দামে জ্বালানি সরবরাহ করবে। সামনে নির্বাচন, এটাও হয়তো তাদের মাথায় রাখতে হবে। দাম বাড়লে অর্থনীতি, শিল্প, জনজীবন সব খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. ম. তামিম বলেন, বিপিসির আর্থিক স্বচ্ছতা নেই। তারা যখন লাভ করেছে তখন তা জানায়নি। এখন বলছে লোকসান হচ্ছে। এটার বিশ্বাসযোগ্যতা কম। আইএমএফ বার বার আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিপিসির অডিট করতে বললেও তা করা হয়নি। আর সরকার বিপিসির কাছ থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব পায়। তাই তারা দাম কমানোর চেয়ে বাড়াতেই আগ্রহী। কিন্তু এটা হওয়া উচিত বাজারনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে দেশেও বাড়বে, কমলে এখানে কমবে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলমও একই অভিযোগ করে বলেন, বিপিসির আয়-ব্যয় কখনও খতিয়ে দেখা হয় না। আর আইন অনুসারে জ্বালানির দাম বাড়ানোর অধিকার বিইআরসির। মন্ত্রণালয় অনৈতিকভাবে এ ধরনের উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনে তারা আদালতে যাবেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকে তার সুবিধা জনগণ পায় না। কিন্তু দাম বাড়লে বর্ধিত মূল্য তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়। এটা অযৌক্তিক। তিনি বলেন, বর্তমানে রফতানি প্রবৃদ্ধি ভালো। এ মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেতিবাচক হবে।
বিপিসির দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তেল বিক্রি করে লাভ করেছে বিপিসি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চার হাজার ২১২ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ বছরে ৬ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে লাভ হয়েছে চার হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এ সময়ে সংস্থাটি ৬ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং রূপালীর দেনা বাবদ তিন হাজার ৮৫ কোটি টাকা, পেট্রোবাংলার পাওনা এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা, ভ্যাটের ৬০৩ কোটি টাকা, ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল ইউনিট-২) জমি কেনা বাবদ ২৩৫ কোটি টাকা এবং লভ্যাংশ হিসেবে সরকারকে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া তিনটি পাইপলাইন ও শোধনাগারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তারা কম দামে তেল বিক্রি করে ২৭ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।