একজন ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধার কথা -ইয়াহিয়া নয়ন

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা সারা জীবন দেশ আর দেশের মানুষের জন্য নিভৃতে সেবা করেন। তাদের খবর কেউ রাখেনা। আজ এই কলামে এমন একজন মানুষের কথা বলবো যিনি ভাষা সৈনিক,মুক্তিযোদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিকিৎসক। তাকে চেনে ইংল্যান্ডের মানুষ,চেনে আরব বিশ্বের মানুষ। প্রচার বিমূখ এই বাংলাদেশী দেশের জন্য অবদান রাখলেও পাননি কোনো স্বীকৃতি বা সম্মাননা।
ডা. মতিয়ূর রহমান। ১৯৪৭ সালে চাঁদপুর জেলার মতলব (উত্তর) স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এ দেশ তখনো ব্রিটিশদের অধীনে। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এ দেশ তখন পাকিস্তান। তৃকালদর্শী এই মানুষটিকে নিয়ে এই লেখা। ছোট বেলায় মায়ের অসুস্থতা দেখে মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন, বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। তাই কলেজ পেরিয়েই  ভর্তি হন মেডিকেল স্কুলে। দেশে তখন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫৬ সালে তিনি ডাক্তারি পাস করেন। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২১শে ফেব্রæয়ারির মিছিলে গুলিবিদ্ধ হন। ডান পায়ে সেই গুলির ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ওই সময়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং ৭ দিন সুত্রাপুর থানায়  আটক ছিলেন।  ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মঞ্চের অগ্রভাগেই ছিলেন তিনি।
তখন তিনি মিডফোর্ড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার। একাত্তরের শহীদ আনোয়ারা ছিলেন তার একজন পেশেন্ট। ২৫ মার্চ রাতের অপারেশনের পর কার্ফু শিথিল হলে তিনি নাখালপাড়ার বাসা থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রাজধানী ত্যাগ করেন।

চলে যান মতলব উত্তরের মধ্য সায়দাবাদ গ্রামে। তারপর শুরু করেন নতুন সংগ্রাম। উদ্বুদ্ধ করেন স্বাধীনতাকামীদের। যে সকল পরিবারের ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে বাড়ি ছাড়েন, তিনি ওইসব পরিবারের পাশে দাঁড়ান। তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। এরপর  ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি আহত এবং অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করেন। দূর দূরান্ত থেকে আহত ও অসুস্থ  যোদ্ধারা তার কাছে আসতেন চিকিৎসা ও অষুধপত্রের জন্য। এ প্রসঙ্গে চাঁদপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এম এ ওয়াদুদ বলেন, যুদ্ধচলাকালে দাউদকান্দির গোয়ালমারীতে গ্রামের মানুষ ঈদের জামাতের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। এ সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক আর্মিরা তাদের ওপর হামলা করে। খবর পেয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা গোয়ালমারীতে ছুটে যাই। পাক বাহিনীকে প্রতিহত করি। শুরু হয় যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আমাদের ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়। তখন পাকিস্তানিদের গুলিতে আমি আহত হই। সেই যুদ্ধে ১২০ জন পাক আর্মি নিহত হয়। ড. মতিয়ূর রহমান আমার চিকিৎসা করেন। আমার শরীরে গুলি লাগার ক্ষতস্থানে শেলাই করেন। ওষুধ এবং অন্যান্য সেবা দিয়ে আমাকে সুস্থ করে তোলেন। এভাবে তিনি দুইশতাধিক মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা করেছেন।

দেশ স্বাধীন হলে ডা. মতিয়ূর চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন চলে যায়। সালটা ছিল ১৯৭৩। লন্ডনের রয়েল কলেজ অব সার্জনস অব ইংল্যান্ড থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি পান। এর পর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ ১১ বছর কাজ করেন। ১৯৮৪ সনে তিনি দেশে ফেরেন। তখন তিনি বিশ্বের বিখ্যাত একজন চক্ষু চিকিৎসক। দেশে বেশি দিন থাকতে পারেননি। সৌদি বাদশার ডাকে তিনি সে দেশে যান। সৌদি আরবের মক্কা মহানগরীর কিং ফয়সাল হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের  সার্বিক দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। তিনি ওই হাসপাতালের চক্ষু বিভাগটি নিজের মতো করে সাঁজিয়ে বিশ্বের উচ্চমানের চিকিৎসাকেন্দ্র করে তোলেন। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে জনপ্রিয় এবং রাজ পরিবারের স্নেহধন্য ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি অসংখ্য ‘চোখ টেরা’ রোগীর চিকিৎসা করে তাদের চোখ ভালো করে তোলেন। এ বিষয়ে তখনকার আরব বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে ডা. মতিয়ূর রহমানের নাম ডাক ছড়িয়ে পরে।  আরবের  বিভিন্ন দেশ থেকে  মানুষজন আসে তাকে দেখার জন্য। যে দেশে বাংলাদেশিরা ‘মিছকিন’ নামে পরিচিত সেই দেশেই  একজন বাংলাদেশি ডাক্তার হন সম্মানিত। তার পরিচয়ে বাংলাদেশ আরব ভূমির মানুষের কাছে নতুন করে পরিচিত হয়।

ব্রিটেন এবং সৌদিতে খ্যাতি ও সম্মান অর্জন করলেও এই মানুষটি দেশের সরকার এবং জনগণের কাছে অপরিচিত রয়ে গেছেন। এখন তার জীবনের শেষ ইচ্ছা তিনি দেশে একটি চক্ষু হাসপাতাল গড়ে তুলতে চান। জীবনের এই পর্যায়ে এসে পেতে চান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। এ নিয়ে স¤প্রতি তার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, আমি আমার জন্মস্থান চাঁদপুর জেলার মতলব (উত্তর) উপজেলার ইসলামাবাদ ইউনিয়নের মধ্যইসলামাবাদ গ্রামে আমার নিজের জমিতেই চক্ষু হাসপাতাল করতে চাই। কিন্তু সমস্যা হলো রাস্তা। ওই জমিতে যাওয়ার রাস্তা খুবই সরু। রাস্তা প্রশস্তের জন্য জমি প্রয়োজন। যাদের জায়গা আছে রাস্তার পাশে, তারা সহযোগিতা করছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সদয় হলে আমার হাসপাতালটা হয়ে যায়। আমি এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সহায়তা চাই, বলেন তিনি। এত বছরেও কেন মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আপনার  নাম নেই? এমন প্রশ্নে কিছু সময় নীরব থাকেন তিনি। এরপর বলেন, প্রথমত: প্রবাসে থাকার জন্যই এ বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করতে পারিনি। প্রবাস থেকে আমি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছিলাম। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। তা ছাড়া এখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে দেশে কি হচ্ছে তা সবাই জানেন। আমার এলাকার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমি চিকিৎসা করে সুস্থ করেছি। তার সাথেই তো আমার নাম তালিকায় থাকার কথা। কিন্তু কেন নেই? তিনি আরো বলেন, একজন চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা করেছি। অথচ তাদের সঙ্গে  আমার নামটা নেই। আমি দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছি।  ভাষা আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছি, জেল খেটেছি। এখন এই বয়সে এসে এসবের স্বীকৃতি চাই। তা কেন পাবোনা?

ডা.মতিয়ূর রহমান লন্ডন থেকে এক আবেদনে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী জনাব এ কে এম মোজাম্মেল হক বরাবরে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চেয়ে পত্র পাঠান। সেটা ছিল ২০১৬ সালের ৯ মার্চ। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধাদের যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে ভ‚মিকা রাখতে পারে মতলব বা চাঁদপুর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। সেখান থেকেই তার নামটা লিপিবদ্ধ হয়ে আসবে। চাঁদপুর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবেন বলে সচেতন মহল মনে করছে।
তিনি তার সারা জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজ এলাকায় নিজের জমিতে একটা হাসপাতাল নির্মান করতে চান। শুধু রাস্তা প্রসস্থ করা দরকার,তাই হচ্ছেনা। এই দেশে এই সমাজে কি এমন মানুষের খুবই অভাব যারা তার পাশে দাঁড়াবে? একজন দেশপ্রেমিক মানুষের স্বপ্ন কি অপূর্ণই রয়ে যাবে?
লেখক : সাংবাদিক,কলামিস্ট।
শস.হধুধহ@ুধযড়ড়.পড়স