Friday, Nov 03 2017

ইয়াহিয়া নয়ন
উন্নয়ন কোন্দল এবং ভোট

একথা সবাই বলছে যে, বাংলাদেশের আর সব নেতার চেয়ে জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে গত কয়েক বছরে দেশের সার্বিক উন্নয়নও হয়েছে চমকপ্রদ। এতে কারো দ্বিমত নেই। কিন্তু ভোটের বাক্সে এর আশানুরূপ প্রতিফলন দেখা যাবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।  সংশয়ের অন্যতম কারণ  তৃণমূলে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র কোন্দল এবং তাদের ক্ষমতার দম্ভ ও অসংযত আচরণ দলকে আরো পিছিয়ে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার আগে ছয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও দ্রুত কোন্দল মেটানোর নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলটির স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের এক সভায় শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার যে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, তার আশানুরূপ প্রতিফলন ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে কাজ করতে নেতাদের পরামর্শও দেন তিনি।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সর্বশেষ সভায় ছয় সিটি করপোরেশনে মাঠপর্যায়ের নানা তথ্য নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনে জয় পেতে দলীয় কোন্দল বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সেখানে আলোচনা হয়। শেখ হাসিনা সভায় বলেছেন, বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নের  পরও ভোটের রাজনীতিতে তার প্রতিফলন দেখা না যাওয়ার বড় কারণ দলীয় কোন্দল। নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত থাকায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে দলের প্রার্থীদের হারতে হচ্ছে। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনে শেখ হাসিনার সঙ্গে অন্য কোনো দলের নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে তাঁদের কেউ জিততে পারবেন না। কিন্তু ৩০০ আসনে তো আর শেখ হাসিনা নির্বাচন করবেন না। যাঁরা ভোটে লড়তে চান তাঁদের অনেকের ওপরই সাধারণ মানুষ বিরক্ত। আবার বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ এমন চরমে উঠেছে যে নিজেরা রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে জড়াচ্ছে। এক দল আরেক দলকে জামায়াত-বিএনপি বলে আখ্যা দিচ্ছে। কেউ আবার নিজের পক্ষ ভারী করতে জামায়াত-বিএনপিকে  দলে ঢোকাচ্ছে। আগামী নির্বাচনের আগে এসব সামাল দেওয়া কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা তথ্য ও জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও এর আগে ছয় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ের পথে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

দলটির তৃণমূল পর্যায়ে  অনেক নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ড ও আচরণ দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। একাধিক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার চেয়ে জনপ্রিয়তায় অনেক পিছিয়ে আছে আওয়ামী লীগ। দি ইনডিপেনডেন্ট ও রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরডিসি) চলতি বছরের মার্চে এক হাজার পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে একটি জরিপ চালায়। ফোনে তাদের মতামত নেওয়া হয়। কিছুদিন আগে তার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৭২.৩ শতাংশ মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন রয়েছে মাত্র ৩৬.১ শতাংশের। জরিপ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৪৯.৭ শতাংশ মানুষ এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যে তারা কাকে ভোট দেবে। তবে জরিপটির ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি যেমন আওয়ামী লীগের চেয়ে পিছিয়ে, তেমনি জনপ্রিয়তায় খালেদা জিয়া অনেক পিছিয়ে আছেন শেখ হাসিনার চেয়ে।

জরিপটির ফলাফলে দেখা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার আওয়ামী লীগ তরুণদের মধ্যে  জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারেনি। আওয়ামী লীগের প্রতি ৩৬.১ শতাংশ মানুষের সমর্থন দেখা গেলেও ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এ সমর্থনের হার ৩৫.৮ শতাংশ। জরিপে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ৭২.৩ শতাংশ মানুষ কিন্তু শেখ হাসিনার প্রতি তরুণদের এ সমর্থনের হার ৭১ শতাংশ।

সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশের তত্ত্বাবধানে জরিপ পরিচালনা করে থাকে এমন একটি পেশাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত একজন গবেষক সেদিন আলাপ প্রসঙ্গে বললেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গেছে, সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তৈরির একটি বড় কারণ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। বিভিন্ন এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে থাকে। এতে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, যা ভোটের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকে ভোট বাড়ানোর জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার পরামর্শ দেন শেখ হাসিনা। তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে টিউলিপ সিদ্দিকের দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ‘প্রথমবার টিউলিপ অল্প ভোটে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু এবার বিপুল ভোটে জয়লাভ করার কারণ সে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। আমাদেরও আগামী নির্বাচনে জয় পেতে হলে বাড়ি বাড়ি যেতে হবে, উঠান বৈঠক করতে হবে। শুধু বড় বড় সভা-সমাবেশ আর মিছিল-মিটিং করলেই চলবে না। ’

দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান মিডিয়াকে বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের প্রপাগান্ডা মোকাবেলা, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সুষ্ঠু অবস্থায় থাকে সেটি নিশ্চিত করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা এসব বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি। ’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন মিডিয়াকে বলেছেন, ‘দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ ও দেশের মানুষকে যতটা ভালোবাসেন আমরা অন্য নেতারা ততটা পারি না। উপরন্তু নেতাদের কর্মকাণ্ড, তৃণমূলের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, ভারসাম্যহীন কথাবার্তা আমাদের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে কিছুটা নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। আমরা মন্ত্রী, নেতা, এমপিরা যদি শেখ হাসিনার আচরণের ৫০ ভাগও ধারণ করতে পারতাম, তাহলে কাউকেই নির্বাচনে জয় নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে জনপ্রতিনিধিদের জনমুখী ও স্বচ্ছ হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। আশা করি, এ সমস্যা অচিরেই কাটিয়ে উঠতে পারব। ’জনপ্রিয়তা বাড়াতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মানুষের বাড়ি বাড়ি যেতে বলেছেন, উঠান বৈঠক করতে বলেছেন। ইতিমধ্যে এটি শুরুও হয়েছে। তবে বর্ষা শেষ হলে এটি ব্যাপকভাবে শুরু হবে। ’

দলীয় কোন্দল প্রসঙ্গে স্বপন বলেছেন, ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই। তবে তা সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। একেবারে কোন্দলহীন দল স্থানীয় স্বৈরাচারের জন্ম দেয় এবং স্থানীয় নেতারা কর্মীমুখী না হয়ে নেতামুখী হন। ফলে দলে বন্ধ্যত্ব আসে। কিন্তু যেসব এলাকায় কোন্দল প্রকট আকার ধারণ করেছে, সেখানে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। কোন্দল নিরসনে কেন্দ্রীয় তৎপরতা চলমান রয়েছে। ’

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড ও সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ঘরোয় আলাপে বলেছেন, ‘শুধু সরকারের উন্নয়ন ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে ভোটে জয় পাওয়া যাবে না। সর্বশেষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। এখানে দলীয় কোন্দল আমাদের মারাত্মক ভুগিয়েছে। অন্য অনেক নির্বাচনেও আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোট পেয়েছেন। আমরা গত কয়েক বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত জ্বালাও-পোড়াওসহ নানা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তার পরও ওরা এত ভোট কিভাবে পায়, তা আমাদের ভাবাচ্ছে। ’

বিগত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার অন্তর্গত ভোটকেন্দ্রগুলোকে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ভোটের ফলাফলে বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের হতাশ করে। জ্বালাও-পোড়াওসহ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত বিএনপির প্রার্থীর এত বিপুল ভোটপ্রাপ্তি নিয়ে চিন্তায় পড়ে আওয়ামী লীগ। সে সময়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একাধিক অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্যে বিএনপি-জামায়াতকে মানুষ কিভাবে ভোট দেয় তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণের পরই আওয়ামী লীগ সভাপতি দলীয় নেতাকর্মীদের মানুষের মন জয়ের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার জোরালো তাগাদা দিতে শুরু করেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের এলাকায় থাকা ও জনমুখী হওয়ার নির্দেশনা দেন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে প্রচারের কৌশল গ্রহণ ও ভোট বাড়ানোর পথ খোঁজা শুরু হয়। কিন্তু কার্যকর কোনো পথ এখনো বের করতে পারেনি ক্ষমতাসীন দলটি। সর্বশেষ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজয় ক্ষমতাসীনদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

আলাপ কালে নেতারা আরো বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি পেশাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে একাধিক জরিপ চালিয়েছি। সেগুলোর ফলাফলে দেখা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ে কতিপয় নেতাকর্মীর ক্ষমতার দম্ভ, অসংযত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা কমাচ্ছে। দেখা যায়, একটি এলাকায় মাত্র কয়েকজন নেতাকর্মী হয়তো খারাপ আচরণ করে, কিন্তু এর জন্য সরকারের প্রতি অনেক মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। মানুষ জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন ভুলে গিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো সমস্যাগুলোকে বড় করে দেখে। ফলে আমাদের ভোট বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। ’

 ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পরও আশানুরূপ ভোট না বাড়ার কারণ খুঁজতে নানা গবেষণা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন অধ্যাপককে নিয়ে এসেও গবেষণা চালানো হয়েছে। তাঁরা গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, এ দেশে দীর্ঘ সময় ঔপনিবেশিক শাসন থাকায় এখানকার মানুষের মধ্যে শাসকবিরোধী একটি মনোভাব এখনো রয়ে গেছে। জনগণ এখনো শাসকদের পুরোপুরি নিজেদের প্রতিনিধি ভাবতে পারে না। এ কারণে সরকার তাদের জীবনমানের কতটুকু উন্নয়ন করল সেটিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে কী দিতে পারল না সেটিকেই তারা বড় করে দেখে। এ জন্য এ দেশে সরকারে থেকে নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানো অনেক কঠিন।
লেখক : সাংবাদিক,কলামিস্ট।

Friday, Nov 03 2017

মোঃ কায়ছার আলী
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু

আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটা গল্প প্রচলিত আছে। এক বিশাল দ্বীপকে নিয়ে গল্পটি তৈরী। এই দ্বীপে প্রায় ৫লাখ লোকের বাস। দ্বীপটির নিরাপত্তা ঝুঁকিপ্রকট। দ্বীপবাসীরা দেখল উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে আকাশ থেকে নেমে আসছে। তারা একে অনুসরণ করল এবং একটি বড় ফাঁকা মাঠে তা এসে থামল। অর্থাৎ সেটাই ছিল একজন দেবদূত। চারিদিকে হাজার হাজার মানুষ এসে জমা হলেন। তাঁরা তার সাথে কথা বলতে চাইলেন। দেবদূত বললেন, “তোমাদের এত লোকের সঙ্গে তো আমার কথা বলা সম্ভব নয় বরং তোমরা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দাও আমি তাদেরকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবো ও কথা বলব। তারা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দিলেন। একজন  বৃদ্ধ শতায়ু, আরেকজন আধুনিক ফিটফাট কেতাদুরস্ত, অন্যজন সাদাসিধা বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিশ্রæতিবদ্ধ বলেই মনে হয়। প্রথমে বৃদ্ধ আসলেন দেবদূত কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলেন “এখন থেকে আটচল্লিশ ঘন্টা পর তোমদের এই দ্বীপে জলোচ্ছ¡াস হবে এবং বাড়িঘর, সহায় সম্পদসহ তোমাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি এখন কি করবে? বৃদ্ধ ব্যক্তি বললেন, “আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, এখন বয়স হয়েছে আর বেশিদিন বাঁচবো না এই সময়ে কান্নাকাটি করে বিধাতার দরবারে মাফ চেয়ে নেব। যাতে পরকালে আমার ভাল হয়। দ্বিতীয় ব্যক্তি একই প্রশ্নের উত্তরে বললেন, “জীবনে আমি অনেক কিছুই ভোগ করেছি এখন যতটুকু সময় অবসর আছে খাওয়া-দাওয়া ফূর্তি ইত্যাদি সেরে নেব। মৃত্যুর পর কি পাব না পাব তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। এবার তৃতীয় ব্যক্তি একই প্রশ্নের উত্তরে চিন্তা করে বললেন (৪৮ঘন্টাকে মনে মনে মিনিট ও সেকেন্ড হিসেব করে নিলেন) “এখনও ১লক্ষ ৭২ হাজার ৮০০ সেকেন্ড সময় আছে আমি আমার দ্বীপের ৫ লাখ লোককে সংগঠিত করে তাদের ১০লাখ হাতকে কাজে লাগাব এবং জলোচ্ছাস আসার আগেই দ্বীপের চারিদিকে এমন বাঁধ নির্মাণ করবো যাতে জলোচ্ছ¡াসের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে এবং একটি লোকেরও যেন জান ও মালের ক্ষতি না হয়।” দেবদূত তার কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আমি তোমার সাথে আছি।” ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা বিরোধীদের যে জলোচ্ছ¡াস তার মোকাবেলার জন্য বাঁধ তৈরিতে উদ্বুদ্ধ ও কাজে লাগনো হচ্ছে নেতা বা রাজনীতিকের কাজ। আপামর জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করাই নেতার সাফল্য। এমন মহান নেতাকে আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। টুঙ্গিপাড়ায় চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু আর কোনদিন কথা বলবেন না, আর কখনও তার কন্ঠে উচ্চারিত হবে না দুখিনী বাংলা মায়ের দাবি আদায়ের কথা। যাব সমস্ত বুক জুড়েই ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র যার অপেক্ষায় ছিল ৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট ভোরের সূর্য, সেদিন প্রতীক্ষায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ছ্ত্রা-ছাত্রী ও শিক্ষকগণ এবং সাড়ে সাত কোটি বাঙালী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে বিশ্বকবি লিখেছিলেন-“এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।”  ঘৃণ্য ঘাতকেরা স্টেনগানের একঝাঁক বুলেট দিয়ে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দেয় এক মহান রাষ্ট্রনায়ককে, এক নিয়তি নির্মাতাকে, যুগশ্রষ্টাকে। জাতির পক্ষ থেকে দেয়া এক অমোচনীয় কালিমা যা কখনো অপসৃত হওয়ার নয়। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। কোটি কোটি দেশপ্রেমিকের পুত পবিত্র ধারায় øাত হয়ে উথ্রিত এই বাংলাদেশটাই তাঁর স্মৃতির মিনার। নদী মেঘলা, শস্য শ্যামলা এই মাতৃভূমিকে তিনি ধ্যানে, প্রাণে তাঁর প্রথম ও শেষ পবিত্র ভূমি বলে নির্ধারণ করেন। জীবনেও মরণে বাংলাদেশকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে। এই মৃত্তিকা পবিত্র থেকে পবিত্রতর হয়েছে তাঁরই বুকে ভেজা তাজা রক্তে। অবিনাশী আপন কীর্তি সমূহ পিছনে ফেলে তাঁর জীবনে রথ দিগন্তে পৌঁছে গেলে এখানে রচিত হয়েছে তাঁর অন্তিম শয়ান। হৃদয় বিদারক মমস্পর্শী ঘটনা চিরদিনই মনে থাকে। একটি আত্মা হুতি একটি জনপদকে আলোড়িত করতে পারে, একটি দুর্ঘটনা (সড়ক,নৌ,বিমান,ট্রেন) মানুষের অনুভুতিতে কয়েকদিনের জন্য ব্যথা বা ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু একজন সকল রাষ্ট্রনায়ক, সরকার প্রধান, অবিসংবাদিত, ক্যারিজম্যাটিক বা সম্মোহনী শক্তি সম্পন্ন নেতার হত্যাকান্ড অথবা শাহাদত প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যুগের পর যুগ একটি দেশ, জাতি বা রাষ্ট্রকে অনুপ্রানিত করে সেই অনুপ্রেরনার আভায় উদ্ভাসিত বাংলার আকাশে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক এক নক্ষত্র চিরভাস্কর প্রতিভাধরের নাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙ্গালীর হাজার বছরের চিরন্তন সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশাল অধ্যায়ের শিরোনাম। এই দেশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসনামলে অনেক রাজধানী ছিল। যেমন- মুুর্শিদাবাদ, গৌড়, একডালা, কর্ণসুবর্ণ, কমান্ত বসাক, পুন্ডনগর, পাটালিপুত্র, সোনারগাঁও, বিক্রমপুর, লক্ষনাবর্তী, পান্ডুয়া, নদীয়া বা নবদ্বীপ। কিন্তু ঢাকাকে রাজধানী করে এই ভূ-খন্ডে স্বাধীন প্রথম মুসলিম বাঙালি শাসক শেখ মুুজিবুর রহমান। দেশী এবং বিদেশী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর রয়েছে সংগ্রামের বর্ণাঢ্য ইতিহাস। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার ফলে  বিদেশী শাসকদের আমরা শাসিত হয়েছি। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, বড় মাছ যেভাবে ছোট মাছকে নদী বা পুকুরে গিলে খায় আমাদের অবস্থা ঠিক সে রকমই হয়েছিল। শত শ্রদ্ধা রেখেই লিখছি হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, হক, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী যা আমাদের দিতে পারেনি সেই মহান স্বাধীনতা তিনি আমাদের এনে দিয়েছেন আর এটা সম্ভব হয়েছে তার সম্মোহনী নেতৃত্বের কারণে। ক্যারিজমা বা সম্মোহনী হচ্ছে নেতা ও তার অনুসারীদের মধ্যে একটি আবেগময় বন্ধন। অন্যভাবে বলা যায় ক্যারিজমা হচ্ছে কোন ব্যক্তির নেতৃত্বের প্রতি চরম ভক্তি বা আসক্তি এবং তার অন্যান্য গুণাবলীর সহিত ব্যক্তিগত আসক্তি। যখন কোন সমাজে বা যে কোন দেশে নানাবিধ কারণে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর সংকট দেখা দেয় তখন ক্যারিজমা সুলভ নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। এই নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী চেতনা এনে দেয় যা স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, অদম্য সাহস ও অকুণ্ঠ আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বত্র গবেষণা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ শে মার্চ ২০০৪ থেকে প্রচারিত বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শ্রোতা জরিপে নির্বাচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ বাঙালির তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৪ই এপ্রিল ২০০৪ “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি” হিসেবে তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের জীবনে ১২ বছরের অধিক কেটেছে কারাগারে, জীবনের অর্ধেক কেটেছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে, পুরো জীবন গেছে স্বাধীনতা নির্মাণে। বাংলাদেশ এর নামকরণ, ছাত্রনেতা হিসেবে কৃতিত্ব, প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিত্ব লাভ, আওয়ামী লীগের জন্ম থেকে সম্পৃক্ততা, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা, ছয় দফা দাবি পেশ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু উপাধি, ৭০-এর নির্বাচন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান, মৃত্যুমুখে জেলখানায় বন্দি জীবন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, মাত্র সাড়ে ৩ বছরের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ, জাতির জনক উপাধির ইতিহাসগুলো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু আমরা কি জানি ওহপষঁংরাব ফবসড়পৎধপু - র কথা। ৭ই মার্চের ভাষনে তিনি বলেন, “যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।” গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের নামে অনেক ভাল চিন্তা ও উদ্যোগ বাতিল হয়ে যায়। শুভ কাজ সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপে পিষ্ঠ হয়। ওহপষঁংরাব ফবসড়পৎধপু হল ভাল পরামর্শ ও প্রস্তাব যদি একজনও হয় তাকে মুল্যায়ন করা উচিত। যে মহান মানুষটি কমপক্ষে একজন লোকের মতামত এবং সর্বোচ্চ লোকের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন অর্থাৎ আপামর জনগণকে জীবন দিয়ে কি রকম ভালবাসতেন তার একটি কথা না লিখে পারছি না। বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট হয়তো বেকায়দায় ফেলতে বা বিব্রত করতে কিংবা সরলভাবে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন “ গৎ. চৎরসব সরহরংঃবৎ যিধঃ রং ুড়ঁৎ য়ঁধষরভরপধঃরড়হ? ” “উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন- ও ষড়াব সু ঢ়বড়ঢ়ষব” এরপর তিনি প্রশ্ন করেন “ডযধঃ রং ুড়ঁৎ ফরংয়ঁধষরভরপধঃরড়হ?” চোখ মুছতে মুছতে প্রতিভাদীপ্ত কন্ঠে বলেন “ও ষড়াব ঃযবস ঃড়ড় সঁপয” অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় সর্বনাশা কালো রাতের (১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট) দৃশ্যপট মানসচক্ষে একবার ভেসে উঠলেই শিহরিত হতে হয়। বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা নিথর দেহের সাথে আরো ছিল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, তার স্ত্রী সুলতানা কামাল, অপর পুত্র শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, ভাই শেখ নাসের ও কর্ণেল জামিলের মৃতদেহ। অন্য বাড়িতে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রী আরজু মনি, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ, রিন্টু খানসহ অনেকের লাশ। পরিশেষে সকলের আত্মার শান্তি কামনা করে মনে করছি একটি আর্টিক্যালে বঙ্গবন্ধুর মত মহান ব্যক্তির জীবনী লিখা অত্যন্ত কঠিন। আমার এখনও বার বার আবৃতি করতে ভাল লাগে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের “কবর” কবিতাখানি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’, বহুমুখী প্রতিভার নোবেল জয়ী বিশ্ব্কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গাইতে আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি এবং হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শুনতে তেজদীপ্ত, বজ্রকণ্ঠে ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণ। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট


Dare makin oka Featured
Monday, Jul 23 2012

Puspen disse at libero porttitor nisi aliquet vulputate vitae at velit. Aliquam eget arcu magna, vel congue dui. Nunc auctor mauris tempor leo aliquam vel porta ante sodales.

Monday, Jul 23 2012

Duis sit amet velit quis augue sollicitudin tempus eget ut dui. Vestibulum ante ipsum primis in faucibus orci luctus et ultrices posuere cubilia Curae; Mauris vehicula

Monday, Jul 23 2012

Duis sit amet velit quis augue sollicitudin tempus eget ut dui. Vestibulum ante ipsum primis in faucibus orci luctus et ultrices posuere cubilia Curae; Mauris vehicula

Seru cadin retu Featured
Monday, Jul 23 2012

Lorem ipsum dolor sit amet, consetetur sadipscing elitr, sed diam nonumy eirmod tempor invidunt ut labore et dolore magna aliquyam erat, sed diam voluptua.

Page 2 of 3

Subscribe to our newsletter

ইভেন্ট

ছবি ও ভিডিও

Style Setting

Fonts

Layouts

Direction

Template Widths

px  %

px  %