Print this page

রোহিঙ্গা : প্রয়োজন আন্তর্জাতিক চাপ


ইউনুস খন্দকার রতন
মিয়ানমারের  সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত  রোহিঙ্গারা  বন্যার স্রোতের মত বাংলাদেশে আসছে।

প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা মাঠ-পাহাড়-বন-জঙ্গল –নদী-খাল পেরিয়ে আসছে। নারী-পুরুষ -বৃদ্ধ- শিশু আসছে। পেছনে আগুনের লেলিহানশিখায় জ্বলছে তাদের বাড়িঘর, অশুভ মেঘের কালোছায়ার মত আকাশে উঠছে ধোঁয়ার কুন্ডলি। বিরান জনপদে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে স্বজনের দাফন না করা লাশ। তারা ফেলে এসেছে ধ্বংস ও ভয়াল মৃত্যু, তাদের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত। তারা এসে লুটিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের মাটিতে- তারা প্রাণ বাঁচাতে চায়, নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করতে চায়, একটু আশ্রয় চায়, আর ফিরে যেতে চায় জন্মভূমির মাটিতে। তারা রোহিঙ্গা, বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠি। রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তা যেমন বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করেছে, পাশাপাশি বিশ্বব্যাপীও তা আলোড়ন তুলেছে। রাষ্ট্রহীন এই জনগোষ্ঠি ভয়াবহ জাতিগত নিধনের শিকার। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এ জাতিগত নিধনের নীলনকশার অনেকটাই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন দিনের আলো মতই পরিষ্কার যে মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগণকে পুরোপুরি নির্মূল ও উচ্ছেদ করতে চাইছে। মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে প্রায় চার লাখ ছিন্নমূল মানুষের আগমন সে কথাই প্রমাণ করে যা এক নজিরবিহীন ঘটনা।রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন হিংস্রতা, বেপরোয়া নৃশংসতা, নিষ্ঠুর বর্বরতায় লিপ্ত মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, তাদের নির্মূল করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। তাদের জন্মভূমি হচ্ছে ইতিহাসের আরাকান, এখন যার নামকরণ করা হয়েছে রাখাইন প্রদেশ। রাখাইনের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ রোহিঙ্গা। সেখানে চলছে নিষ্ঠুর গণহত্যা। মানবরূপী বর্বর, অহিংসার নামে হিংসার অনুসারী বৌদ্ধ কর্তৃপক্ষ এ বর্বরতা চালাচ্ছে।রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে যা হচ্ছে তা ব্যাপক বিস্তৃত এক পদ্ধতিগত নিপীড়ন।  মিয়ানমার তার রোহিঙ্গা জনগণকে পুরোপুরি শূন্যে নামিয়ে আনছে। এটি বড় ধরনের জাতিগত নিধন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।বাড়ির পাশে রোহিঙ্গা নিধনের ব্যাপারে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেখা গেছে, ২৫ আগস্ট সর্বশেষ সহিংসতা শুরুর পরই ভারত রোহিঙ্গা নির্মূলে মিয়ানমারের প্রতি বলিষ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও তাদের দেশত্যাগের বন্যার মধ্যে ৫-৭ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সফর করেন। কিন্তু এ সফরকালে বা পরেও রোহিঙ্গা বিষয়ে তিনি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। অন্যদিকে তিনি মিয়ানমার পৌঁছনোর প্রাক্কালে ভারত সে দেশে আশ্রয় নেয়া ৪০ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে ঘোষণা করে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মোদির মিয়ানমার সফর ও রোহিঙ্গা ফেরতের ভারতীয় ঘোষণা কাকতালীয় নয় বলে মনে করেন। ভারতে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ফেরত পাঠানোর ঘোষণার সমালোচনা করে জাতিসংঘ। পরে ভারত মিয়ানমারকে এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানায়।লক্ষণীয় যে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু জনগন যখন বাংলাদেশ সীমান্তে আছড়ে পড়েছে তখন আঞ্চলিক শক্তি ভারত এ বিষয়ে নীরব থেকেছে। এ উদ্বাস্তু সমস্যা যে বাংলাদেশের জন্য  বিপদের কারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের বিপদ বা রোহিঙ্গা মানবিক সমস্যা কোনোটিই নয়াদিল্লীকে প্রভাবিত করেনি, তাদের নীতি-কৌশলের হিসেবের খাতায় তা আঁচড় কাটতে পারেনি। বিশ্লেষকদের মতে, স্বাভাবিক ভাবে ভারতের কাছে তার জাতীয় স্বার্থ সবকিছুর আগে। মিয়ানমারে রয়েছে তারত্রিমুখী স্বার্থ বাণিজ্যিক, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত। প্রথমত মিয়ানমার বিমসটেকে ভারতের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। ভারত তার গুরুত্বপূর্ণ ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রথম ধাপ হিসেবে মিয়ানমারকে বিবেচনা করে। উত্তরপূর্ব ভারতের মিজোরামের সাথে মিয়ানমারের সমুদ্র পথের সংযোগ স্থাপন করতে নয়াদিল্লী রাখাইন স্টেটের ভিতর দিয়ে বাস্তবায়ন করছে ৫০ কোটি ডলার ব্যয়সাপেক্ষ কালাদান মাল্টিমোডালট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট। কিছু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে বাংলাদেশ যদি কখনো ভারতকে ট্রানজিট দিতে না চায় তাহলে এটাই হবে ভারতের বিকল্প।নয়াদিল্লী আরো চাইছে সিপিইসির বিকল্প হিসেবে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিদেশীয় মহাসড়ক প্রকল্প। দ্বিতীয়ত উত্তরপূর্ব ভারতের জঙ্গি আন্দোলন দমন করতে হলে মিয়ানমারের দীর্ঘ সহায়তা নিতেই হবে। তাই ভারত কখনোই মিয়ানমারকে দূরে রাখবে না। অতি সম্প্রতি মিয়ানমারের সাথে ভারত উত্তরপূর্ব ভারতের জঙ্গি দমনে যৌথ অভিযান চালায়। তৃতীয়ত চীনের প্রভাব রোধ করা। তার জন্য মিয়ানমারকে পাশে টানা জরুরি। মূলত এ জন্যই মিয়ানমারকে কোনোভাবেই ক্ষুব্ধ না করতে সতর্ক ভারত। এ অবস্থায় ভারতের কাছে বাংলাদেশ না মিয়ানমার কার গুরুত্ব ও বন্ধুত্ব প্রকৃতপক্ষে বেশী মূল্যবান তা অন্যদের কাছে স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা বিষয়ে ভারতের ‘উদাসীনতা’য় বাংলাদেশ আহত বলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাংশের ধারণা। আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের আহত মনোভাবে উপশমের প্রলেপ বুলাতে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ প্রেরণের ব্যবস্থা নিয়েছে ভারত। কিন্তু ঘনিষ্ঠতম বন্ধু বাংলাদেশের স্বার্থে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের দেশে ফিরিয়ে নিতে ভারত মিয়ানমারকে বলবে বা চাপ দেবে কিনা তা কেউ জানে না।মিয়ানমার বিষয়ে অপর আঞ্চলিক শক্তি চীনের ভূমিকাও স্পষ্ট। বেইজিং মিয়ানমারের প্রতি জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে। কারণ যথারীতি চীনেরও জাতীয় স্বার্থ তার কাছে বড়। মিয়ানমারের সাথে চীনের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সীমিত নিষেধাজ্ঞার সময়ে চীন দেশটির সাথে নিকট সম্পর্ক বজায় রাখে। এদিকে অং সান সু চি-র ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সে দেশের বিভিন্ন সশস্ত্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের শান্তি আলোচনায়ও মধ্যস্থতা করছে চীন। চীন মিয়ানমারের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী, তার সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এখন ভূরাজনৈতিক স্বার্থে দেশটির সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে সে আগ্রহী। রাখাইনে চীন কায়াখফু বন্দর গড়ে দিচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে এ রকম একটি বন্দর সুবিধা চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারত মহাসাগরে চীনা নৌবাহিনীর উপস্থিতির ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে। রাখাইনকে কেন্দ্র করে চীনের বহত্তর পরিকল্পনা থাকতে পারে। অন্যদিকে মিয়ানমারের গ্যাস চীন ব্যবহারের লক্ষ্যে কুনমিং পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। এ থেকে দেখা যায় যে চীন মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কৌশলগত দিককে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎবিশ্ব পরাশক্তির আগামী দিনের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে ভারতের সাথে টক্কর দিতে মিয়ানমারকে পাশে রাখতে চায় সে। তাই তাকে নাখোশ না করার বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছে চীন। চীন বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭৫ সাল থেকেই চীনের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বহাল রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ঘটনায় চীনের নীতিতে আধিপত্যবাদ বা আঞ্চলিক প্রাধান্য বিস্তার তথা আগ্রাসী মনোভাব দেখা যায় না। দোকলাম মালভূমি নিয়ে ভারতের সাথে সৃষ্ট সাম্প্রতিক সংকটে সামরিক সংঘাত এড়াতে চীনের আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণেরও চীনের প্রতি ভালো ধারণা রয়েছে। চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময়চীন বাংলাদেশের সাথে ২৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে নানাভাবে সহায়তা করে আসছে দেশটি। অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান ইকনোমিক করিডোরের (সিপিইসি) মত মেগা ইনিশিয়েটিভ গ্রহণ ও বাস্তবায়নকরে চলেছে চীন। এতে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৪ বিলিয়ন ডলার। চীনের উচ্চাভিলাষী ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ভিশনের অংশ হিসেবে এ ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়িত হচ্ছে যার লক্ষ্য হচ্ছে প্রাচীন রেশম পথের পুনরুজ্জীবন করে ইউরোপ ও আফ্রিকাকে স্থল ও নৌপথে চীনের সাথে যুক্ত করা। অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখনো চীন থেকে ভারত অনেক পিছিয়ে। চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ভিশনে বিশ্বের বহু দেশ সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু চীনের বারবার আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভারত এতে অংশ গ্রহণ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ দু’ বন্ধু চীন ও ভারত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের গৃহীত অবস্থানের প্রতি এখনো প্রকাশ্যসমর্থন ব্যক্ত করেনি। তবে ১৩ আগস্ট বাংলাদেশস্থ বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরগুলো পরিদর্শন করে তাদের মানবেতর অবস্থা পরিদর্শন করেন। তারা সবাই স্ব স্ব দেশকে বিষয়টি জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারত ও চীনের হাইকমিশনার ও রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শনের পর এ দু’টি দেশের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটে কিনা তা দেখার বিষয়। সর্বশেষ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা সমস্যায় ঢাকার পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন।বাংলাদেশ শান্তিকামী দেশ। তাই শান্তিপূর্ণ ভাবে এ সমস্যার সমাধান চায়। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য এক মারাত্মক সমস্যা। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা উভয়ই এখন চাপের মুখে। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্যে ১২ সেপ্টেম্বরেই বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। আগে থেকে আছে আরো লাখ পাঁচেক। এ বিরাট জনগোষ্ঠি যে কোনো অর্থেই বাংলাদেশের জন্য বোঝা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তার পরিষ্কার কথা রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যেতে হবে, মিয়ানমারকে ফিরিয়ে নিতে হবে তার নাগরিকদের। কথা হচ্ছে, মিয়ানমার এতে আগ্রহ দেখায়নি যে কারণে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান করা রোহিঙ্গারা আজো নিজ জন্মভূমিতে ফিরতে পারেনি। এ ব্যাপারে ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মানবিক অবস্থানে বাংলাদেশ এগিয়ে, কিন্তু কূটনীতিতে পিছিয়ে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন ও ভারতকে পাশে রাখতে পেরেছে মিয়ানমার, কিন্তু বাংলাদেশ পারেনি। মিয়ানমারকে দীর্ঘদিন শাসন করেছে সামরিক বাহিনী। এখনো মিয়ানমারে শিশু অবস্থায় রয়েছে গণতন্ত্র, আর গণতন্ত্রের ঝোলানো ব্যানারের আড়ালে রয়েছে ক্ষমতাশালী সামরিক বাহিনীর শ্যেন দৃষ্টি। তাকে এড়িয়ে যাবার সাধ্য সরকারের কার্যত প্রধান অং সান সু চি’র নেই।মিয়ানমার বহির্বিশ্বকে অতীতে খুব একটা মূল্য দেয় না বলেই অতীতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে দেশটির উপর অবরোধ আরোপ করেছিল। তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। পরে আবার নিজেদের স্বার্থেই সে অবরোধ ব্যাপকহারে শিথিল করে তারা। এখন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র আর নেবে বলে মনে হয় না। কার্যত, এতদিন লিপ সার্ভিস দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করছে, এখনো তাই করবে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তারা উদ্যোগী ভূমিকা নিতে চায় না, কারণ এখানে আপাতত তাদের কোনো স্বার্থ নেই। কিন্তু আজ রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে কসোভো মডেলের একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন।লক্ষ্য করা যায় যে গত অক্টোবর ও আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর রোহিঙ্গাদের কথিত হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামী জঙ্গিবাদের কার্ড খেলেছে মিয়ানমার। আনান কমিশন ২৪ আগস্টে তাদের রোহিঙ্গা বিষয়ক রিপোর্ট পেশ করার একদিন পর বিদ্রোহী রোহিঙ্গা গ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালানোর কোনো যৌক্তিকতা মেলে না। কারণ এ রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের পক্ষেই সুপারিশ ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এ হামলাকে রোহিঙ্গা নিধন ও উচ্ছেদের এবং এ অঞ্চলে ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থান হিসেবে প্রদর্শনের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে মিয়ানমার। ভারত কাশ্মীরীদের স্বাধীনতার লড়াই ও চীন জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের সংগ্রামকে ইসলামী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বলে গণ্য করে। এ ব্যাপারে রয়েছে তাদের স্পর্শকাতরতা। এ অভিন্ন কারণে রোহিঙ্গা প্রশ্নে ঐক্যমত্যে পৌছেছে এ তিন দেশ। এ অবস্থায় চীন-ভারতের সাথে নিবিড় আলোচনা ও তার মাধ্যমে দেশ দু’টিকে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত বোঝাতে অবস্থা হবে। সে সাথে কফিআনান কমিশনের রিপোর্ট কার্যকর ভাবে বাস্তবায়নেও বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে বারবার সম্মুখীন হতে হবে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যার।রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর কোনো বিকল্প নেই। যেহেতু এ বিষয়ে মিয়ানমার অনড় সে কারণে কূটনীতিই বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা। আর সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের ওপর সবচেয়ে বেশী চাপ সৃষ্টি করতে পারে ভারত ও চীন। সে সাথে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ-র ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সমর্থন পেতে প্রয়োজন ব্যাপক ভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগের।জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন ও কর্তৃপক্ষের অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে। সে সাথে সহিংসতা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের সার্বিকদিক বিবেচনা করে মিয়ানমারের চলমান সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেবার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।

লেখক : ছাত্রলীগ কর্মী।
কাহারোল,দিনাজপুর।

Read 280 times
Rate this item
(0 votes)
Published in কলাম
Super User

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Mauris hendrerit justo a massa dapibus a vehicula tellus suscipit. Maecenas non elementum diam.
Website: smartaddons.com

Latest from Super User

9 comments

  •  Start 
  •  Prev 
  •  1 
  •  2 
  •  3 
  •  Next 
  •  End