শ্রদ্ধাভরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ

রাজনীতি
Typography
  • Smaller Small Medium Big Bigger
  • Default Helvetica Segoe Georgia Times

শ্রদ্ধাভরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ


রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ও নিজ ভাষার মান রক্ষায় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী জাতির শ্রেষ্ঠসন্তানদের ফুলেল শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে গোটা দেশ।

'একুশ মানে মাথা নত না করা' এই প্রত্যয়ে শহীদদের স্মরণে বুধবার প্রথম প্রহরে দেশের সব শহীদ মিনার ফুলে ফুলে ভরে উঠতে থাকে। মাইকে বাজতে থাকে রফিক, জব্বার, সফিউরদের স্মরণে গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি!'

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রতিষ্ঠায় রাজপথে নামা বাঙালির বুকের তাজা রক্ত ঝরেছিল। এভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তাজা প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভাষার দাবি। আর তার হাত ধরেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

ভাষা শহীদদের স্মরণের এই দিনটি আজ আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্বের সব দেশে নিজ নিজ ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

গোটা দেশে দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। বুধবার প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর স্পিকার শিরীণ শারমিন চৌধুরী ফুল দেন শহীদ বেদীতে। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা।

একে একে শহীদ মিনারে ফুল দেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা। এরপর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হক, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ, পুলিশ প্রধান মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়োরী শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও তার পর ঢাকাস্থ বিভিন্ন মিশনের কূটনীতিকরা ফুল দেন। বাংলাদেশ-ভারত মিডিয়া সংলাপে আসা ভারতের সাংবাদিকরাও শহীদ বেদিতে ফুল দেন। আসেন একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতারা।

সহকর্মীদের নিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আকতারুজ্জামান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য এবং শিক্ষক সমিতির নেতারাও শহীদ বেদিতে ফুল দেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাসদের দুই অংশ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, সাম্যবাদী দল, বাসদের তিন অংশ, গণসংহতি আন্দোলন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া শহীদ বেদীতে ফুল দেয় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।

তবে এবার প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যায়নি বিএনপি। দলটি সকালে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে।

রাত ১২টা বাজার আগেই হাজারো মানুষ ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে যান শহীদ মিনার অভিমুখী লাইনে। বিশিষ্টজনদের শ্রদ্ধা জানানোর পর শহীদ মিনার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

এদিকে সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতে একুশের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয় শ্রদ্ধা জানানোর পালা। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে সব শহীদ মিনার।

প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন। এরপর একে একে বেদীতে ফুল দেন- ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, রাঙামাটির সাংসদ ঊষাতন তালুকদার, চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, আওয়ামী লীগ, সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী, পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম জেলা ও চট্টগ্রাম মহানগর কমান্ড, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব।

এদিকে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে ভাষা শহীদদের স্মরণের পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস। এ চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর সব ভাষাভাষী মানুষের সাথে নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হোক, লুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো আপন মহিমায় নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে উজ্জীবিত হোক, গড়ে উঠুক নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে কাজ করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, আসুন দলমত নির্বিশেষে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখি। সবাই মিলে একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। প্রতিষ্ঠা করি জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে দেশ গঠনে ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। তিনি বলেন, একুশের শহীদদের আত্মবলিদান বাঙালিকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস জুগিয়েছে। এ সাহসই ছিল ১৯৭১ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামের অনুপ্রেরণা। আর বাংলাভাষী জনগণের জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে এই প্রেরণাকে বুকে লালন করতে হবে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালন করছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ও জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশনেও অনুষ্ঠান হবে।